মা হলেন জর্ডান ফেরত কিশোরী, বাবা হয়নি কেউ!

প্রকাশিত: ১১:১০ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ৩০, ২০১৮ | আপডেট: ১১:১০:পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ৩০, ২০১৮

স্বপ্নের জর্ডানে গিয়ে সব স্বপ্ন দুঃস্বপ্ন হয়ে গেছে মানিকগঞ্জের সিংগাইরের কিশোরী মৌসুমীর (ছদ্মনাম)। বাবার কোনও জমি নাই। তাই তার স্বপ্ন ছিল নানির বসতভিটায় একটি থাকার ভালো ঘর তুলবে। বাবা-মা, ছোট ভাই ও বোনের দায়িত্ব নেবে।

কিন্তু দুর্ভাগ্য, পরিবারের সদস্যদের ভাগ্যের পরিবর্তন তো দূরের কথা, নিজের জীবনই আজ বিপন্ন। যারা তার জীবনকে দুঃস্বপ্নে পরিণত করেছে তাদের বিচার তো হয়নি বরং তাদের সঙ্গে করতে হয়েছে আপোস। এখন তার পরিবারও সমাজচ্যুত (একঘরে)।

জানা গেছে, সংসারের অভাব দূর করতে ২০১৬ সালের ২৩ অক্টোবর মৌসুমীকে জর্ডানে পাঠায় তার পরিবার। স্থানীয় এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে তাকে মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমির দেশটিতে পাঠানো হয়। ১৫ বছরের এ কিশোরীর বয়স ২৫ বছর বানিয়ে পাসপোর্ট করে দেয় স্থানীয় এক আদম ব্যবসায়ী।

এছাড়া জর্ডানে যাওয়ার আগে মেডিকেল রিপোর্টে অবিবাহিত মৌসুমীকে দেখানো হয় বিবাহিত। কথা ছিল বাসা-বাড়িতে কাজ দেওয়ার। কিন্তু প্রতি রাতেই তাকে সইতে হয়েছে নির্মম নির্যাতন। বাধ্য করা হতো শারীরিক সম্পর্কে।

একপর্যায়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে মৌসুমী। কাজের সন্ধানে বিদেশ গিয়ে যৌন হয়রানির শিকার এ কিশোরী দেশে ফেরার পর সমাজে নিগৃহীত হচ্ছে। গত পাঁচদিন আগে তার কোলজুড়ে এসেছে একটি ফুটফুটে কন্যা সন্তান। এরপর সমাজপতিরা তার পরিবারকে সমাজচ্যুত (একঘরে) করে রেখেছে। এ অবস্থায় মহাবিপাকে পড়েছে পরিবারটি।

মৌসুমীর বাবা রিকশাচালক। তার বাবা-মা মেয়ের এই পরিণতির জন্য স্থানীয় জয়মন্টপ ইউনিয়নের ভাকুম গ্রামের আবুল কাশেম ও জর্ডানে থাকা একই উপজেলার চান্দহর ইউনিয়নের চর চামটা গ্রামের নিহাজ উদ্দিনের মেয়ে সোনিয়াকে দায়ী করে তাদের উপযুক্ত শাস্তি দাবি করেছেন। যার মাধ্যমে জর্ডানে গিয়েছিল মৌসুমী সেই আবুল কাশেমের বিরুদ্ধে মামলা করলেও সেই মামলা আপোস করতে বাধ্য হয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবার।

গত রবিবার কথা হয় জর্ডান ফেরত মৌসুমী ও তার বাবা-মার সঙ্গে। মৌসুমী জানান জর্ডানে অবস্থানকালে এক বছর ৫ মাসের সেই দুঃসহ দিনগুলোর কথা। বাসা-বাড়ির কাজের কথা বলে নিয়ে যাওয়ার পর তাকে কোনও কাজই করতে দেওয়া হয়নি।

প্রতি রাতে তাকে বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে যৌন সম্পর্কে বাধ্য করা হতো। যখন জর্ডানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো মৌসুমী তখনও তার বয়স ১৫ বছর হয়নি। অথচ তার বয়স ২৫ বছর বানিয়ে পাসপোর্ট করে দেয় আবুল কাশেম। এছাড়া জর্ডানে যাওয়ার আগে মেডিকেল রিপোর্টে অবিবাহিত এ কিশোরীকে বিবাহিত দেখানো হয়।

আদম ব্যবসায়ী আবুল কাশেম মাত্র ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে তাকে জর্ডানে পাঠানোর চুক্তি করে। স্থানীয় একটি এনজিও থেকে ওই টাকা ঋণ করে জর্ডানে পাঠানো হয় মৌসুমীকে। কথা ছিল বাসা-বাড়িতে কাজ দেওয়া হবে তাকে।

ভুক্তভোগী এ কিশোরীর অভিযোগ, ‘জর্ডানে থাকা সোনিয়া একটি বাসা ভাড়া নিয়ে তার মতো আরও ২০ থেকে ৩০ জন নারীকে দিয়ে জোরপূর্বক ‘দেহ ব্যবসা’ চালিয়ে আসছেন। স্থানীয়ভাবে তিনি প্রভাবশালী। কারণ প্রায় ১৬ বছর ধরে তিনি জর্ডানে রয়েছেন।’

অভিযোগ রয়েছে, জর্ডানে পৌঁছানোর পর মৌসুমীকে তার পরিবারের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ করতে দেওয়া হয়নি। তার বাবা-মা স্থানীয় দালাল কাশেমের কাছে খোঁজ নিতে গেলে বলা হয়েছে, জর্ডান থেকে মৌসুমী পালিয়ে গেছে।

এই পরিস্থিতিতে আদম ব্যবসায়ী আবুল কাশেমের বিরুদ্ধে মেয়ের সন্ধান চেয়ে মামলাও করেন মৌসুমীর বাবা। কয়েক মাস হাজতে থাকেন আবুল কাশেম। পরে স্থানীয়দের মধ্যস্থতায় ও কাশেমের পরিবারের আকুতির মুখে মামলাটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। কথা ছিল ২০ হাজার টাকা মৌসুমীর পরিবারকে দেওয়া হবে। কিন্তু জেল থেকে বের হওয়ার পর প্রতিশ্রুতির একটি টাকাও তাদের দেওয়া হয়নি।

মৌসুমী ও তার মার অভিযোগ, ‘যারা মামলাটি প্রত্যাহার করতে মধ্যস্থতা করেছেন তাদের পকেটে চলে গেছে এ টাকা।’

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের প্রথম দিকে মৌসুমীর বাবা ও মা জানতে পারেন, তার মেয়ে সিংগাইর উপজেলার চান্দহুর ইউনিয়নের চর চামটা গ্রামে নিহাজ উদ্দিনের মেয়ে সোনিয়ার কাছে জর্ডানে আছেন। সোনিয়ার সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলে বিষয়টি নিশ্চিত হন তার মা-বাবা।

এদিকে জর্ডানে যাওয়ার পর তার ওপর নির্যাতনে কথা জানাতে গিয়ে মৌসুমী বলেন, ‘প্রতি রাতে যৌন নির্যাতনে বাধ্য করা হতো। এতে রাজি না হলে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হতো। গরম খুন্তি দিয়ে পিঠে ছ্যাঁকা দিয়েছে। পায়ে শিকল দিয়ে ঘরে আটকে রাখা হতো।

প্রথমে যে বাসায় তাকে নিয়ে যাওয়া হয় সেখানে প্রথম রাত থেকে তার ওপর যৌন হয়রানি শুরু হয়। বাসার মালিক কয়েক মাস তার কাছে রাখার পর তাকে বিক্রি করে দেয় সোনিয়া নামে এক বাংলাদেশির কাছে। তার বাড়িও সিংগাইর উপজেলায়।

সোনিয়া তাকে ভালো কাজ দেওয়ার কথা বলে নিজের বাসায় নিয়ে যায়। জর্ডানের দাম্মাম শহরের যে বাড়িতে নিয়ে যায় সেখানে তাকে ভিনদেশি একজনের সঙ্গে জোরপূর্বকভাবে শারীরিক সম্পর্কে বাধ্য করা হয়েছে। দেশে ফিরে আসার দুই মাস আগেও প্রতিটি রাতে তাকে ভিনদেশিদের যৌন নিপীড়ন সহ্য করতে হয়েছে।’

ভুক্তভোগী মৌসুমী বলেন, ‘সোনিয়ার ভাড়া বাসাটি একটি মিনি পতিতালয়। তার মতো আরও ২০ থেকে ৩০ জন বাংলাদেশিকে আটকে রেখে দেহ ব্যবসা করানো হয় সেখানে।’
অভিযোগ সূত্রে আরও জানা যায়, মৌসুমী যখন অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন তখন সোনিয়া তাকে পুলিশের কাছে ধরিয়ে দেয়। প্রায় দুই মাস জেল খাটার পর গত ১৮ এপ্রিল জর্ডান সরকারের সহায়তায় দেশে ফিরে আসেন তিনি।

তিনি জানান, জর্ডান সরকার তার পাসপোর্টে লিখে দিয়েছে ‘সে কখনও আর জর্ডানে প্রবেশ করতে পারবে না।’

মৌসুমীর অভিযোগ, ‘দীর্ঘদিন ধরে আটকে রেখে দেহ ব্যবসা করানো হলেও তাকে শুধু তিন বেলা ভাত দেওয়া হতো। এছাড়া একটি টাকাও দেওয়া হতো না। টাকা চাইলে উল্টো মারধর করা হতো।’

তার আকুতি, ‘তার মতো আরও ৩০ জন নারীকে সোনিয়ার খপ্পর থেকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা হোক। নয়তো তার মতো কলঙ্কিত হয়ে দেশে ফিরতে হবে তাদের। পরিবারের বোঝা হয়ে বাকি সময় কাটাতে হবে।’

ভুক্তভোগী মৌসুমী ও তার পরিবার জর্ডানে থাকা সোনিয়া আক্তারের উপযুক্ত শাস্তি দাবি করেন। সেই সঙ্গে যে কন্যা সন্তানটি বাবার পরিচয় ছাড়াই ভূমিষ্ঠ হলো তার ভবিষ্যৎ নিয়েও তারা উদ্বিগ্ন।

মৌসুমীর মা বলেন, ‘বড় আশা করে মেয়েকে বিদেশে পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু সে আশায় গুড়েবালি। এখন মেয়ের সন্তান কার পরিচয়ে বড় হবে তা নিয়েই বেশি দুশ্চিন্তা। নিজেদের সংসারই চলছে না, তার ওপর মেয়ের কন্যা সন্তান হয়েছে। এদিকে গত বৃহস্পতিবার সিংগাইর হাসপাতালে সিদ্দিক নামের একজনকে (অজ্ঞাত) মৌসুমীর স্বামীর পরিচয় দেওয়া হয়েছে। এটা অন্যায় জেনেও ডাক্তারদের চাপে ওই ভুয়া নামটি ব্যবহার করা হয়েছে।

মৌসুমীর বাবা বলেন, ‘অবিবাহিত মেয়ে বিদেশ থেকে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে ফিরেছে। এলাকার মানুষজনের নানা কানাঘুষায় তারা বাড়ির বাইরে বের হতে লজ্জা পাচ্ছেন। এমন অবস্থার মধ্যে গ্রামের সমাজপতিরা পরিবারকে সমাজচ্যুত করার ঘোষণা দিয়েছে। এখন মরার উপর খাড়ার ঘা। সমাজের মাতব্বর আলেক উদ্দিন কোরবানি ঈদের আগে তাকে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, সমাজ থেকে তাকে একঘরে করা হয়েছে। তাকে ওই সমাজের কোনও লোক সহযোগিতা করবে না।’

এ বিষয়ে স্থানীয় আদম ব্যবসায়ী আবুল কাশেম বলেন, ‘অনেক নারী শ্রমিককে তিনি বিদেশে পাঠিয়েছেন। মৌসুমীর মতো এমন ঘটনা কারও সঙ্গে হয়নি।’

এজন্য তিনি স্থানীয় আয়েশা নামের এক নারীকে দায়ী করে জানান, আমি তাকে ম্যানপাওয়ার করিয়ে দিয়েছি মাত্র। জর্ডানে যাওয়ার ব্যাপারে আয়েশা সবকিছু করে দিয়েছে। এই নিয়ে মৌসুমীর বাবা মামলা করেছিল। তাকে বিদেশ থেকে আনার পর স্থানীয়ভাবে বসে মামলাটি আপোস করা হয়েছে।

সিংগাইর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) খন্দকার ইমাম হোসেন জানান, ঘটনাটি তার জানা নেই। এ ব্যাপারে ওই মেয়েটির পরিবার যদি আইনগত সহায়তা চান সেক্ষেত্রে তিনি আইনগত সহায়তা করবেন।


ad