বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সিনেমার নাম কেন ‘৫৭০’?

টিবিটি টিবিটি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ৭:০২ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৬, ২০১৮ | আপডেট: ৭:০২:অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৬, ২০১৮

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী তিনি, বাঙালী জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান। তেতাল্লিশ বছর আগের এই দিনে সপরিবারে তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাসভবনে। এই মানুষটাকে নিয়ে, এই ন্যাক্কারজনক হত্যাকাণ্ডটা নিয়ে আজ পর্যন্ত একটাও পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা বানাতে পারিনি আমরা। অথচ পাশের দেশ ভারতে মহাত্মা গান্ধীকে নিয়ে সিনেমা হয়েছে, সুভাষ চন্দ্র বোসকে নিয়ে সিনেমা বানানো হয়েছে, এপিজে আবদুল কালাম বা রাজীব গান্ধীর হত্যাকান্ড নিয়েও সিনেমা বানানো হয়েছে সেখানে। আব্রাহাম লিঙ্কন থেকে শুরু করে নেলসন ম্যান্ডেলা- সবাইকে নিয়েই সিনেমা বানানো হয়েছে। অথচ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আজ পর্যন্ত কোন পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মিত হয়নি বাংলাদেশে।

তবে হতাশার দিন ফুরিয়ে এলো বলে। তরুণ নির্মাতা আশরাফ শিশির ঘোষণা দিয়েছেন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সিনেমা বানানোর। মূলত পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্টের বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের বিষয়টাই তার সিনেমার মূল উপজীব্য বিষয় হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। আর সিনেমার নাম দেয়া হয়েছে ‘৫৭০’। ২০২০ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে আগামী বছর ১৫ আগষ্ট দেশে ও দেশের বাইরে মুক্তি পাবে ছবিটি। কিন্ত বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বানানো সিনেমার নাম ‘৫৭০’ হবে কেন? সেটা জানতে হলে ফিরে যেতে হবে আজ থেকে ঠিক ৪৩ বছর আগের দিনটিতে, ১৫ই আগস্ট ১৯৭৫ এ। চলুন, আপনাদের সবাইকে একটু ফ্ল্যাশব্যাকে ঘুরিয়ে নিয়ে আসি।

শারদীয় শরত। আকাশে সাদা মেঘের ভেলা নেই অবশ্য। কেমন একটা গুমোট ভাব চারপাশে। ভোর হবার আগেই পাখির ডাকে মুখরিত হয়ে থাকে গ্রামটা। আজ পাখিদেরও যেন ছুটি, তাদের ডাকাডাকি কোন এক অজানা কারণে বন্ধ। গ্রামে রেডিও আছে। গতকাল রাতে ঢাকায় কি ঘটেছে, সেটা এতক্ষণে পুরো গ্রামের মানুষ জেনে গেছে। কেমন যেন একটা চাপা ভয়ের আবেশ চারপাশে। এই গ্রামের সবচেয়ে বিখ্যাত মানুষটাকে গতকাল সপরিবারে মেরে ফেলা হয়েছে। বুলেটে ঝাঁঝরা করে দেয়া হয়েছে শরীর, যে শরীরটা বাংলাদেশের মানচিত্রের একটা প্রতিচ্ছবি ছিল। সবাই কেমন যেন অদ্ভুত চাপা স্বরে কথা বলছে, যেন দেয়ালেরও কান আছে!

সকাল নাগাদ খবর চলে এলো, লাশ নিয়ে আসা হবে টুঙ্গিপাড়ায়, দাফন করা হবে এখানেই। কবর খোঁড়ার নির্দেশ দেয়া হলো। দুপুর দুইটা নাগাদ শোনা গেল হেলিকপ্টারের রোটরের গমগম আওয়াজ, সেই আওয়াজে কেমন যেন মৃত্যুর ভয়ঙ্কর হিমশীতলতা মিশে আছে!

টুঙ্গিপাড়ার থানার পাশের হেলিপ্যাডে নামলো উড়োযানটা। আশেপাশে ভীড় জমিয়েছিল অজস্র মানুষ, প্রিয় শেখ সাব’কে একবার দেখতে চায় তারা! কিন্ত পুলিশ তাড়িয়ে দিল সবাইকে, তাদের ওপর তেমনই নির্দেশ, লোকজন জড়ো হতে দেয়া যাবে না কোনভাবেই। পুরো জায়গাটা ঘিরে রেখেছে পুলিশ। হেলিকপ্টার নামতেই দরজা খুলে বেরিয়ে এলো অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত কয়েকজন সেনা। বন্দুক উঁচিয়ে পজিশন নিয়ে নিলো সবাই। কফিনটা বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে ডেকে আনা হলো কয়েকজনকে।

কফিনসহই লাশটাকে মাটিচাপা দিতে চাইছিল সেনারা। কিন্ত কবরের ভেতরে কফিন ঢোকানোর জায়গা ছিল না। ডেকে আনা হলো দুজন ছুতারকে। তারা কফিন ভাঙলেন, বেরিয়ে এলো লাশটা। বুকে চব্বিশটা গুলির ক্ষত, যে তর্জনী উঁচিয়ে ধরে বাঙালীর স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন, সেই আঙুলটা প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে শরীর থেকে! বঙ্গবন্ধুর নিথর শরীরটা ঢেকে রাখা হয়েছে একপ্রস্থ কাপড় আর বরফ দিয়ে, সেই বরফের পানি রক্তের সঙ্গে মিশে তৈরি করেছে অদ্ভুত এক বরফ গলা নদীর, যে নদীর জলের রঙ লাল!

লাশের আশেপাশে কয়েকজন ছাড়া আর কাউকে ভিড়তে দেয়া হচ্ছিল না। জানাযা পড়ানোর জন্যে যাকে আনা হয়েছিল, সেই মাওলানা পালিয়ে গিয়েছিলেন ভয়ে। লাশ কবরে নামানোর জন্যে জোর করছেন হেলিকপ্টার থেকে নেমে আসা জলপাই উর্দি পরা সেনারা, তখন বেঁকে বসলেন রজব আলী নামের একজন। রেডক্রস অফিসের পিয়নের চাকুরী করা এই ভদ্রলোক বললেন, ইসলামী বিধিবিধান মতো লাশ দাফন করতে হবে। দশ মিনিট সময় দেয়া হলো দাফনের প্রস্তুতির জন্যে। লাশের সঙ্গে আসা কাপড়টা ততক্ষণে রক্ত আর পানিতে ভিজে পুরোপুরি লাল হয়ে গেছে। কয়েকজন ছুট লাগালেন কাপড় আর সাবানের খোঁজে।

রেডক্রসের রিলিফের কাপড়গুলো কিছুদিন আগে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই বিলি করা হয়েছিল সারাদেশে, এসেছিল টুঙ্গিপাড়াতেও। সেই কাপড় ছিঁড়েই বানানো হলো কাফনের কাপড়। দোকান থেকে কিনে আনা হলো সস্তা একটা তিব্বত ৫৭০ সাবান। আর কাউকে ধারেকাছে আসতে না দিয়ে দাফনের কাজটা সেরে ফেলা হলো তড়িঘড়ি করে। সেনারা উঠে গেল হেলিকপ্টারে, রোটরের গমগম আওয়াজ শোনা গেল আবার, একটা সময় দৃষ্টিসীমানা থেকে হারিয়ে গেল যন্ত্রদানবটা। টুঙ্গিপাড়ায় মা-বাবার কবরের পাশে শুয়ে রইলেন বঙ্গবন্ধু!

যে মানুষটার হাত ধরে বাংলাদেশ নামের দেশটার জন্ম হয়েছিল, যে মানুষটা একাই পাকিস্তানের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিলেন, যে মানুষটার একটা নির্দেশে লক্ষ লক্ষ বাঙালী মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, জীবন দিয়েছিলেন, বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলেন, সেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া শরীরটাকে শেষবারের মতো গোসল করানো হলো লাল রঙের একটা তিব্বত ৫৭০ সাবান দিয়ে। রক্তেভেজা শরীরটা লাল হয়ে গিয়েছিল, সেই রক্তগুলো ধোয়ার কাজও করেছে লাল রঙেরই একটা সাবান! কেমন অদ্ভুত একটা মিল!

এবার বাস্তবে ফিরে আসি। সিনেমার নাম কেন ‘৫৭০’ রাখা হয়েছে, সেটা সম্পর্কে এতক্ষণে বুঝে যাওয়ার কথা সবার। আশরাফ শিশির বলছিলেন-

“বঙ্গবন্ধুর পুরো জীবন নিয়ে চলচ্চিত্র বানানোর সাধ্যি কিন্তু আমার নাই। আমার ছবিতে মূলত উঠে আসবে যখন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হলো, তারপর ২৪ ঘন্টা! সবাই জানেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর কাপড় কাচার সস্তা সাবান(৫৭০) দিয়ে শেষ গোসল করানো হয়েছিলো এবং রিলিফের কাপড় দিয়ে কাফন দেয়া হয়েছিলো। তখনকার সময়ে সেনাবাহিনী একটা হেলিকপ্টারে করে বঙ্গবন্ধুর লাশ টুঙ্গিপাড়া নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো। কিন্তু তারা নামতে পারছিলেন না। কারণ নীচে হাজার হাজার মানুষ এসে জড়ো হয়েছিলো। তারপর পুলিশ দিয়ে প্রটেক্ট করে তারা লাশ নিয়ে নেমেছিলো। তাদের উপর নির্দেশ ছিলো, যে কফিনে করে বঙ্গবন্ধুকে গোপালগঞ্জ নেয়া হয়েছিলো সেই কফিনসহ কবর দিয়ে ঢাকায় চলে আসতে হবে। আমি আমার সিনেমায় বঙ্গবন্ধু হত্যার চব্বিশ ঘন্টাকেই সিনেমায় তুলে ধরতে চাই। এজন্য এই ছবির নাম ৫৭০!”

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড নিয়ে ট্রিলজি বানাতে চান বলেও জানিয়েছেন আশরাফ শিশির। তিনি বলেছেন-

“আমার তিনটা গল্প আছে বঙ্গবন্ধুর নিহত হওয়ার ঘটনা নিয়ে, তার মৃত্যুকে ঘিরে। এই তিনটা গল্প নিয়ে আমি ট্রিলোজি করতে চাই। এর প্রথম অংশটাই হচ্ছে ‘৫৭০’। যিনি একটা দেশের স্বাধীনতা এনে দিলেন, আমার ছবির যে ঘটনাটা তার কয়েক ঘন্টা আগেও যিনি রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন, অথচ তার যে প্রক্রিয়ায় অন্ত্যষ্টিক্রিয়া হয়েছিলো এটা হৃদয়বিদারক। এটা কেন ঘটেছিলো? স্বাধীনতা বিরোধীরা বার বার বলার চেষ্টা করেন যে বঙ্গবন্ধুর জানাজায় কোনো লোক হয়নি, অথচ অমুকের জানাজায় লাখ লাখ লোক হয়েছিলো! আসলে সত্যটা কী? কী ঘটেছিলো? এসবই আসলে আমি আমার নির্মিতব্য ‘৫৭০’ ছবিতে তুলে ধরার চেষ্টা করবো।”

তবে ট্রিলজির চিন্তাভাবনা পরে, আপাতত ‘৫৭০’ সিনেমাটা ঠিকঠাকভাবে নির্মাণ করতে চান আশরাফ শিশির। সিনেমার প্রযোজক আপাতত তিনিই। পরে হয়তো অন্য কেউ যোগ হবেন এই তালিকায়। আর সিনেমাটা ভালোভাবে বানানোর জন্যে সবার সাহায্য চান তিনি। যেহেতু এটা একটা ইতিহাসনির্ভর সিনেমা, সেজন্যে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয় বা প্রতিপ্রক্ষা মন্ত্রণালয়, সবাইকেই পাশে চান আশরাফ শিশির। অনেক দেরীতে হলেও কেউ একজন উদ্যোগ নিয়েছেন বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মতো বিষয়কে সেলুলয়েডে তুলে ধরার, সেখানে সরকারেরও উচিত এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে এটার পাশে থাকার।

সুত্র: এগিয়ে চলো।